Latest News
সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪ ।। ২রা বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
Home / মতামত / পাসপোর্ট বিতর্কের লাভ-ক্ষতি

পাসপোর্ট বিতর্কের লাভ-ক্ষতি

আমীন আল রশীদ

জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অনেক ইস্যু ছাপিয়ে হঠাৎ করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পাসপোর্ট ইস্যুতে কেন বিতর্ক শুরু হলো বা শুরু করা হলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তবে যেহেতু বিতর্কটা শুরু হয়েছে, সুতরাং এর কিছু সম্ভাব্য পরিণতির কথা বলা যাক।
দেশের রাজনীতিতে ওয়ান ইলেভেন বা এক-এগারোর পট পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ২০০৭ সালের ৭ মার্চ একটি দুর্নীতি মামলার আসামি হিসেবে তারেক রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। ওই সময়ে তার বিরুদ্ধে আরও ১৩টি দুর্নীতির মামলা দায়ের করা হয় এবং বিচারের সম্মুখীন করা হয়। আটকাবস্থায় তাকে প্রচণ্ড শারীরিক নির্যাতনেরও অভিযোগ ওঠে। প্রায় দেড় বছর কারাভোগ শেষে ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তিনি সবগুলো মামলায় জামিন পান এবং এর কয়েকদিন পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে রওনা হন। জাতীয় সংসদে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছেন, এ মুহূর্তে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা, একটি রাষ্ট্রদ্রোহ মামলাসহ আটটি মামলা চলছে। আর দুটি মামলায় তার সাজা হয়েছে।
তারেক রহমান বিভিন্ন সময়ে বঙ্গবন্ধু এবং স্বাধীনতার ইতিহাস সম্পর্কে কটূক্তি করে বিতর্কের জন্ম দিলেও এবার তার পাসপোর্ট জমা দেওয়া এবং কথিত নাগরিকত্ব বর্জন ইস্যুতে পুনরায় আলোচনায় এসেছেন। এবার অবশ্য তাকে আলোচনায় এনেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম। গত ২৩ এপ্রিল তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ২০১৪ সালের ২ জুন তারেক রহমান ও তার স্ত্রী-কন্যা তাদের পাসপোর্ট যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সমর্পণ করেছেন। সেখান থেকে ওই পাসপোর্ট লন্ডনে বাংলাদেশের দূতাবাসে পাঠানো হয়েছে। পাসপোর্টগুলো এখন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে সেখানে রক্ষিত আছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দাবি, তারেক রহমান বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বর্জন করেছেন। আইনমন্ত্রীও মনে করেন, আপাতত তারেক রহমান বাংলাদেশের নাগরিক নন।

তবে প্রশ্ন উঠেছে, পাসপোর্ট জমা দিলেই তাকে ‘নাগরিকত্ব বর্জন’ বলা যায় কিনা? সরকারের দাবি, তারেক রহমানের পাসপোর্টের মেয়াদ ছিল ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। এরপর তিনি মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন করেননি। তাছাড়া তার কাছে স্মার্ট পরিচয়পত্রও নেই। ফলে তার কাছে এখন আর বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে কোনও ডকুমেন্টই অবশিষ্ট নেই। সে হিসেবে তিনি এখন আর বাংলাদেশের নাগরিক নন। যদিও বিএনপি নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এক কাঠি এগিয়ে আওয়ামী লীগকে উদ্দেশ করে বলেছেন, ‘তারেক রহমান দেশে আসবেন, এজন্য তো কারও ওস্তাদি করার দরকার নেই। এটা তো খুব বড় একটা কাজ না। তারেক রহমান অবশ্যই আসবেন।’

পাসপোর্ট বিতর্কের মধ্যে বিএনপি বলছে, তারেক রহমান জন্মসূত্রে বাংলাদেশি। সুতরাং পাসপোর্ট হস্তান্তর করলেও তার নাগরিকত্ব যাবে না। এই তথ্যটি নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে আওয়ামী লীগের তরফে। তাদের যুক্তি, তারেক রহমানের জন্ম ১৯৬৪ সালে, যখন বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম হয়নি। তাছাড়া তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানেও (আজকের বাংলাদেশ) জন্মগ্রহণ করেননি। বরং তার জন্ম পাকিস্তানের করাচি শহরে। সে হিসেবে তারেক রহমানকে জন্মসূত্রে বাংলাদেশি বলার সুযোগ নেই বলে মনে করেন ক্ষমতাসীন দলের কোনও কোনও নেতা।

রাজনীতিবিদদের এই কথার লড়াইয়ে অবশ্য বসে নেই বহিরাগমন ও পাসপোর্ট অধিদফতরও। প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাসুদ রেজোয়ান ২৬ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, বাংলাদেশি পাসপোর্ট ছাড়াই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান লন্ডনে বসবাস করছেন। তিনি যদি পাসপোর্টের আবেদন করতে চান, তবে তাকে দেশে ফিরতে হবে। তবে মহাপরিচালক এও মনে করিয়ে দেন যে, দুই ধরনের ব্যক্তিকে পাসপোর্ট দেওয়া হয় না। এক. আবেদনকারী যদি দুই বছরের বেশি সাজাপ্রাপ্ত হন; দুই. গ্রেফতার এড়াতে পলাতক অবস্থায় থাকা কোনও ব্যক্তি। তারেক রহমান যেহেতু ২ বছরের বেশি সাজাপ্রাপ্ত আসামি, সুতারং তার পাসপোর্ট পাওয়ার কোনও সুযোগ নেই বলে জানান মহাপরিচালক।

সরকারের তরফে যখন তারেকের এই পাসপোর্ট ও নাগরিকত্ব বর্জন ইস্যুটি তোলা হলো তখন এই পুরো বিষয়টিকে সন্দেহের চোখে দেখছে বিএনপি। ২৪ এপ্রিল সংবাদ সম্মেলনে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দাবি করেন, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যে নথির বরাতে বলছেন যে, তারেক রহমান ও তার স্ত্রী কন্যা পাসপোর্ট হস্তান্তর করেছেন, সেই নথিতে বেশ কয়েকটি সুস্পষ্ট ভুল রয়েছে। যেমন চিঠিতে লেখা আছে, ‘বাংলাদেশ অ্যাম্বাসি’। কিন্তু হবে ‘হাইকমিশন অব বাংলাদেশ’। এতে যে টেলিফোন ও ফ্যাক্স নম্বর দেওয়া আছে, সেটিও অস্বাভাবিক। ‘ডিয়ার স্যার’ লেখার পরিবর্তে ‘ডিয়ার স্যারস’ লেখা আছে। চিঠিতে চারটি পাসপোর্টের কথা বলা হলেও নিচের দিকে আবার একটি পাসপোর্টের কথা বলা হয়েছে। চিঠির শেষাংশে ‘ফেইথফুলি’র ‘এফ’ বড় হাতের অক্ষর দিয়ে লেখা হয়েছে; ব্রিটিশরা এভাবে লেখে না। আবার যিনি সই করেছেন, তার কোনও নাম নেই। এসব বিবেচনায় চিঠি নিয়ে যথেষ্ট রহস্য রয়েছে বলে বিএনপি মনে করে।

এই বিতর্কের মধ্য দিয়ে কিছু বিষয় পরিষ্কার হওয়া গেছে। যেমন:

১. তারেক রহমান লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন, যেটি বিএনপিও স্বীকার করেছে। অথচ বিএনপি এতদিন বলে আসছিল যে, তিনি লন্ডনে চিকিৎসার জন্য আছেন।

২. তারেক রহমানের পাসপোর্ট তার নিজের হাতে নেই এবং এটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।

৩. দেশে আসতে হলে তারেক রহমানকে বাংলাদেশ হাইকমিশনের মাধ্যমে ট্রাভেল পাস নিতে হবে।

৪. যেহেতু তার স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র নেই, তাই বাংলাদেশে এসে পাসপোর্টের জন্য আবেদন করলেও তারেক রহমানের পাসপোর্ট পাওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই।

৫. তারেক রহমান একাধিক মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত। ফলে এই সরকারের আমলে দেশে এলেই তিনি গ্রেফতার হবেন। অতএব তিনি যে স্মার্ট পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট নেওয়ার জন্য বাংলাদেশে আসবেন না, তা পরিষ্কার।

তারেক রহমানের এই পাসপোর্ট হস্তান্তরের ঘটনাটি ২০১৪ সালের। তখন বিষয়টি নিশ্চয়ই সরকার জানত। কিন্তু চার বছর পরে এমন একটি সময়ে, বিশেষ করে যখন প্রধানমন্ত্রী কমনওয়েলথ সম্মেলনে অংশ নিয়ে দেশে ফিরেছেন, সেই সময়ে বিষয়টি কেন সামনে আনা হলো এবং এর দ্বারা কোন পক্ষ কী অর্জন করতে চায়, তা বলা মুশকিল। সরকার বা সরকারি দলের নেতারা হয়তো চাইছেন এই ইস্যু দিয়ে তারেক রহমানকে আরও বেশি কোণঠাসা করা এবং দেশের মানুষের কাছে তাকে হেয় করা। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতির যে চরিত্র, তাতে বলা যায় যে, তারেক রহমান যদি সত্যি সত্যিই বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন, তাও আওয়ামী লীগকে পছন্দ করবে না এবং বিএনপি সমর্থক কোটি কোটি মানুষ বিশ্বাস করবে না। আমাদের দেশের রাজনীতিতে প্রতিহিংসা এতটাই শেকড় গেঁড়ে বসেছে যে, সত্যিকারের কোনও অপরাধে কোনও শীর্ষ রাজনীতিবিদ সাজাপ্রাপ্ত হলেও অসংখ্য মানুষ মনে করেন, এটা ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। ফলে দুর্নীতি বা এরকম গুরুত্বপূর্ণ মামলাগুলো গুরুত্ব হারাতে থাকে।

তারেক রহমানের এই পাসপোর্ট বিতর্কের কারণে দেশের মানুষ জানতে পারছে না, লন্ডনে কমনওয়েলথ সম্মেলনে বাংলাদেশ কী অর্জন করলো, বিশেষ করে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশ্বনেতারা কী বললেন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক কতটা ফলপ্রসূ হলো। যদিও এসব বিষয় নিয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়তো সংবাদ সম্মেলন করবেন। তবে তার সফরের পরেই এসব বিষয় নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণ হওয়ার কথা থাকলেও, সেই জায়গাটি দখল করে নিলো তারেক রহমানের পাসপোর্ট ইস্যু। এতে তারেক রহমান কতটা জিরো হচ্ছেন বা হিরো, তা বলা মুশকিল। আবার এই পাসপোর্ট ও নাগরিকত্ব ইস্যুটি আইনি এবং অ্যাকাডেমিক আলোচনার বিষয় হলেও এটি এমনভাবে রাজনীতিকীকরণ হয়ে যাচ্ছে যে, মূল আলোচ্য বিষয়গুলোই ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে।

বাস্তবতা হলো, বিএনপি ক্ষমতায় না এলে তারেক রহমান স্মার্ট পরিচয়পত্র বা পাসপোর্ট নেওয়ার জন্য বাংলাদেশে আসবেন, এমনটি ভাবার কোনও কারণ নেই। কারণ দেশে এলেই যে গ্রেফতার হবেন, তা তিনি নিজেও জানেন। আবার বিএনপি যদি কোনোদিন ক্ষমতায় যায় এবং তখন যদি তারেক রহমান দেশে আসেন, তখন তার পাসপোর্ট আছে কী নেই, কয়টি মামলায় তিনি সাজাপ্রাপ্ত, সেসব কোনও গুরুত্ব বহন করবে না। বরং তখন সরকার, সরকারি দল এবং তাদের বুদ্ধিজীবী ও গণমাধ্যমের একটি অংশ তাকে হিরো বানাবে এবং এটি প্রতিষ্ঠিত করবে যে, বিগত সরকার তাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে নির্বাসিত করে রেখেছিল। ফলে তারেক রহমান একজন বীর হিসেবে হিসেবে দেশে আসবেন। ফলে একাধিক মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে তারেক রহমানকে দেশে এনে বিচারের যে কথা সরকার বলছে, সেটির কী পরিণতি হয় এবং এর ফলে দেশের রাজনীতি, বিশেষ করে আগামী জাতীয় নির্বাচনে এই পাসপোর্ট বিতর্ক কতটা ভূমিকা রাখবে, তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন

লেখক: সাংবাদিক